গ্রাহকের সর্বোচ্চ ঋণসীমা ঠিক করে দিতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক
আলমগীর হোসেন
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম
ছবি: এআই জেনারেটেড
গ্রাহক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ নিতে পারবেন- সেই সীমা নির্ধারণ করে দিতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। সেইসাথে, বড় ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের অর্থায়নে বন্ড মার্কেটকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও ভাবছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং খেলাপি ঋণ কমাতেই এ উদ্যোগ নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ উদ্যোগ ইতিবাচক, বলছেন বিশ্লেষকরা। তাদের অভিমত, কোনো উদ্যোক্তাকে তার মোট সম্পদের তুলনায় বেশি ঋণ দেওয়া ঠিক নয়।
বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথার কারণ খেলাপি ঋণ। এর পেছনে দায়ী হাতে গোনা কয়েকটি বড় শিল্প গোষ্ঠী। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যারা ঋণের নামে লুটপাট চালিয়েছে ব্যাংকিং খাতে। প্রচলিত আইনে একক ঋণ গ্রহীতা সীমা নির্ধারিত থাকলেও, একজন গ্রাহক পুরো ব্যাংকিং খাত থেকে কত টাকা ঋণ নিতে পারবে, তার কোনো সীমা নেই। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে, নামে বেনামে ভূয়া কোম্পানি খুলে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে আলোচিত কয়েকটি শিল্প গোষ্ঠী। যাদের কাছে এখন জিম্মি পুরো ব্যাংকিং খাত।
তাই এ ধরনের ঋণ নেয়ার সুযোগ বন্ধে নতুন ঋণ নীতিমালা করতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। যেখানে একজন উদ্যোক্তা পুরো ব্যাংকিং খাত থেকে কত টাকা ঋণ নিতে পারবেন তার সীমা ঠিক করে দেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিক বেশি। দেখা গেছে, মুষ্টিমেয় দুই-একটি বা তিন-চারটি গ্রাহকই সিংহভাগ খেলাপি ঋণের জন্য দায়ী। এই কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক চাচ্ছে, গ্রাহককে সর্বোচ্চ ঋণ বা আর্থিক সুবিধার সীমা দ্বারা ঋণের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে না দিয়ে, তাকে নির্দিষ্ট কত টাকা দেওয়া যাবে তা নির্ধারণ করে দিতে।
এদিকে বিশ্লেষকেরাও বলছেন, সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত না থাকায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণ নেয়ার সুযোগ পেয়েছে গ্রাহকরা। ফলে এসব ঋণের অপব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে। কোনো গ্রাহককেই তার মোট সম্পদের অতিরিক্ত ঋণ দেওয়া ঠিক নয় বলেও মনে করেন তারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, গ্রাহককে একাধিক ব্যাংক ঋণ সরবরাহ করুক, তাতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে একটি ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের ঋণ কোনো অবস্থাতেই তার মোট সম্পদের সীমা অতিক্রম করতে পারবে না। এছাড়া, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে চাহিদার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়ে টাকা পাচারের ঘটনা ঘটছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আবার, স্বল্প মেয়াদে আমানত নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদি বিনিয়োগ করে বিপাকে পড়েছে অনেকে ব্যাংক। তাই নতুন নীতিমালায় বড় ও দীর্ঘ মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিবর্তে বন্ড মার্কেটকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এ নীতি কার্যকরের আগে বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করা জরুরি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, দেশে বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করতে পারলে, ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো যারা এই মুহূর্তে কিছুটা লিকুইডিটি ক্রাইসিসে আছে কিন্তু ব্যাংক গুলোর সামর্থ্য নেই তাদেরকে পর্যাপ্ত ঋণ সহায়তা প্রদানের, তাদের উচিত বন্ড মার্কেটে চলে যাওয়া।
এ বিষয়ে একই মত দেন বিআইবিএম-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সিকিউরিটি মার্কেট থেকে নেওয়াই ভালো। এছাড়া সরকারের বন্ড মার্কেট তৈরি করা উচিত বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সরকারি বন্ড মার্কেট না থাকলে করপোরেট বন্ড মার্কেট তৈরি হয় না।
তবে, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই মধ্যে নির্ধারিত সীমায় নামিয়ে আনতে লক্ষ্যমাত্রাও ঠিক করে দেওয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে।
/এনএ