জীবনানন্দ দাশ: নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়
প্রত্যয় সাহা
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম
আজ ২২ অক্টোবর, কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুবার্ষিকী। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বেড়ে ওঠা জীবনানন্দ দাশ ঠিক ১৯৫৪ সালের এই দিনেই অনন্তলোকে যাত্রা করেন। 'নিঃসঙ্গতার কবি'র মৃত্যুর ৭২ বছর এই লেখার জন্ম।
রবীন্দ্র পরবর্তী যুগে আধুনিক কবিদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ জীবনানন্দ দাশ। যদিও তাকে কোনো বিশেষ সময়ের কবি হিসেবে পরিচয় করানো উচিত নয়, তিনি কালজয়ী। জীবনানন্দ শৈল্পিকতার শীর্ষে থাকা মানুষ, যিনি শব্দের ঝংকারে শুধু সময়কে চিত্রিত করেই ক্ষান্ত হননি, বাংলা কবিতার প্রচলিত নিয়ম ও রেখা ভেঙে নতুন মেরু নির্মাণ করেছেন। আজ তার প্রয়াণ দিবসে দাঁড়িয়ে আমরা তার লেখার কাছে, তার সৃষ্টির কাছেই ফিরছি বারবার।
জীবনানন্দ মানুষের অবচেতন মনের গহীনে আলো জ্বেলেছেন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে। তার কবিতার ভেতর এক কল্পময় অগ্রসর জগতের অস্তিত্ব বিদ্যমান। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষ কতটা একা এবং এই একাকিত্বই মানুষকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়। জীবনানন্দের কবিতায় উঠে এসেছে প্রকৃতির অধরা সৌন্দর্য, যেখানে প্রকৃতিই যেন এক রক্ত-মাংসের চরিত্র। যিনি ধানসিঁড়ি নদীর তীরে শঙ্খচিল শালিকের মাঝে খুঁজে পেয়েছিলেন অপার্থিব শোভা। জীবনানন্দ দাশের প্রকৃতিপ্রেমের কথা সর্বজনবিদিত, তাই তাকে বলা হয় 'রূপসী বাংলার কবি'।
জীবনানন্দের কবিতায় ঘুরেফিরে এসেছে বিপন্ন বিস্ময় কথাটি। আধুনিক সভ্যতার ঘেরাটোপে মানুষের একাকিত্ব, হতাশা ও বেঁচে থাকার নিরর্থকতাকে তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার কবিতায় মৃত্যু, নিঃসঙ্গতা ও মানুষের অস্তিত্বের সংকটের মতো বিষয়গুলো বহুবার ব্যবহৃত হতে দেখা গেছে। তিনি মানুষের অনুভূতি ও অস্তিত্বের গভীর দিকগুলোকে সত্যায়িত করেছেন স্বাভাবিকভাবেই।
জীবনানন্দ লিখেছেন 'সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি'। জীবনানন্দের কল্পনায় এই 'কেউ কেউ' কারা হতে পারে? তার ভাষ্যমতে, এই বিশেষ জাতের মানুষের রয়েছে নিজস্ব চিন্তা ও স্বতন্ত্র জগত। এরা কল্পনা ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জীবনের রূপ চেনার চেষ্টা করেছে। যে প্রকৃতির অপরূপ রূপের বর্ণনা জীবনানন্দ করেছেন, বাস্তবে তাকে আমরা আর খুঁজে পাই না। পাই না বলেই হয়তো হারানো সেই সৌন্দর্যকে আমরা নিজের ভেবে আরও প্রবলভাবে আকড়ে ধরি।
তিনি কবিতার সুরে বেঁধেছেন বিষণ্ণতার খেলাঘর, তার কবিতায় সবচেয়ে উজ্জ্বল যে রং, তাও বিষন্ন ধূসর; অথচ জীবনানন্দের সমকালে কেউ তাকে বুঝে উঠতে পারেনি। জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে আমাদের আগ্রহ ও বিস্ময় প্রায় অন্তহীন। তার ব্যবহৃত শব্দের ভেতর থেকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার সন্ধান পাওয়া সম্ভব। সেই সব শব্দ থেকে বিচ্ছুরিত হয় যুগপৎ আলো ও অন্ধকার। এজন্যই সম্ভবত কবি শঙ্খ ঘোষ জীবনানন্দকে আখ্যায়িত করেছেন 'কবিতার জাদুকর' হিসেবে।

বুদ্ধদেব বসু তাকে ‘নির্জনতম কবি’ বলে সম্বোধন করেছিলেন কিন্তু তিনি নির্জনতার বিপরীতেও লুকিয়ে থাকতেন। তিনি ছিলেন একজন নীরব বিপ্লবী, যিনি আমাদের চিন্তার জগতকে প্রসারিত করেছেন। শিখিয়েছেন নক্ষত্রের সাথে কথা বলতে, ঘাসের বিছানায় শুয়ে আকাশ দেখতে এবং মানুষের ভেতরের মানুষ সন্ধান করতে। আজকের এই যান্ত্রিক ও গতিশীল পৃথিবীতে জীবনানন্দ দাশ আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।
জীবনানন্দ প্রায় ৭ শ'র মতো কবিতা লিখলেও জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছিল মাত্র ২৭০টি। 'বনলতা সেন', 'রূপসী বাংলা', 'আবার আসিব ফিরে', 'বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি', 'আট বছর আগের একদিন'সহ তার রয়েছে অসংখ্য কালজয়ী কবিতা। জীবনানন্দ দাশের কবিতা তরুণদের ভাবতে শেখায়, প্রকৃতিকে নতুন করে দেখতে শেখায় এবং জীবনের গভীর অর্থ অন্বেষণে উদ্বুদ্ধ করে। "আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে– এই বাংলায়" পঙতিটি বাংলার রূপকে অমর করে রাখে। আরেকটি লাইন উল্লেখ করি– "আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হয়ে আকাশে-আকাশে" আকাশের অন্তহীন নীলিমার দিগন্ত-বিস্তৃত ছবিকে একটি লাইনে আঁকা হয়েছে। একেই বলে ম্যাজিক রিয়েলিটি। আকাশ কথাটার পুনরাবৃত্তি করবার জন্যেই ছবিটি একেবারে স্পষ্ট, সজীব হয়ে উঠেছে। শব্দের মূল্য সৃষ্টির এমন পরিচয় খুব কম বাঙালী কবিই দিতে পেরেছেন।
ঠিক কী কারণে জীবনানন্দের কবিতায় আমরা এতো মুগ্ধ হই, এতো শিহরিত হই? খোঁজ করলে প্রথমেই দেখা যাবে, জীবনানন্দের কবিতায় মিল, অন্ত্যমিলের ব্যবহার আমাদের কাছে অতুলনীয় ঠেকছে। তার কবিতার বিষয়, উপমা, উৎপ্রেক্ষার ব্যবহার একান্তই তার নিজস্ব। জীবনানন্দের কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য শব্দ, স্পর্শ, রং, রূপ, গন্ধের অনুভূতিমুখর বাণী। এ কথা ঠিক যে, এগুলো সরাসরি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, উজ্জীবিত মন্ত্রে এক মুখর অনুভূতি। এমন ধারা বাংলা কবিতায় অভিনব।
ব্যক্তি জীবনানন্দ ঠিক কেমন ছিলেন? জানার কৌতূহল হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। ব্যক্তি জীবনানন্দ দাশ ছিলেন শান্ত প্রকৃতির। জীবনানন্দ দাশের লেখাপত্র ঘাঁটলে দেখতে পাই– তিনি বিশ শতকের জটিল মনস্তত্ত্বের শ্রেষ্ঠ রূপকার। জীবনানন্দ দাশ একটা অপ্রকাশিত চিঠিতে লিখেছিলেন– "আমি বিশিষ্ট বাঙালিদের মধ্যে পড়ি না। আমার বিশ্বাস, জীবিত মহত্তর বাঙালিদের শ্রদ্ধা পাওয়ার মতনও কেউ নই আমি। কিন্তু আমি সেই মানুষ, যে প্রচুর প্রতিকূলতা সত্ত্বেও প্রতিটি দ্রব্যকে সোনা বানিয়ে তুলতে চায় অথবা মহৎ কিছু— যা শেষ বিচারে কোনো একটা জিনিসের মতন জিনিস— কিন্তু ভাগ্য এমনই যে, তার খাদ্য জুটছে না। কিন্তু আশা করি, ভবিষ্যতে খাঁটি মূল্যের যথার্থ ও উপযুক্ত বিচার হবে। আমার ভয় হয়, সেই ভালো দিন দেখতে আমি বেঁচে থাকব না।"
সময়ের যাত্রাপথে নানা অমসৃণ পথ পার হতে হয়েছে জীবনানন্দকে। অনেক টানাপোড়েন সহ্য করতে হয়েছে। দুর্বোধ্যতার অভিযোগ শুনতে হয়েছে আমৃত্যু। তিনি যা আশঙ্কা করেছেন, তাই হয়েছে। জীবদ্দশায় নিজের সাফল্যের তেমন কিছুই দেখে যেতে পারেননি। কবির মৃত্যুর আগে তার প্রতিভার মূল্যায়ন সেভাবে হয়নি। মহাকালের স্রোতে বহু সময় পেরিয়ে গেলেও জীবনানন্দের কবিতা আজও বাঙালির মনে অম্লান। কবি আজও মানুষের হৃদয়ে সমানভাবে বেঁচে আছেন। আর বেঁচে থাকবেনই বা না কেন! যে কবি এমন কালজয়ী লাইন লেখার ক্ষমতা রাখেন, তার তো অনন্ত কাল ধরে বেঁচে থাকবারই কথা।
"আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন- কতদিন আমিও তোমাকে
খুঁজি নাকো;- এক নক্ষত্রের নিচে তবু- একই আলো পৃথিবীর পারে
আমরা দুজনে আছি; পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,
প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়.."
"আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে– এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয়– হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল-ছায়ায়.."
/এএম