বর্ষায় বাঙালির মনন ও শৈল্পিকতায় ভিন্ন মাত্রিক রূপ দান করলেন রবীন্দ্রনাথ। যা মনের প্রেম, কল্পনা ও মাধুরীর স্ফুরণ ঘটায়। বিশাল আকাশে প্রলয়ের ন্যায় ঘনকালো মেঘের অন্ধকার আর চমকানো বজ্রের ঘনঘটা যেন মনে বিরহ, বিষাদ আর অপূর্ণতার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে তোলে।
প্রেম ও সৌন্দর্যের কবি রবীন্দ্রনাথ বর্ষাকে শৈল্পিক অবধূতিকায় আবরিত করেছেন। বর্ষাকে কেন্দ্র করে যথার্থ সুর ও বাণীর যে তীব্র আবেদন তা যেন পূর্ণতা পায় রবীন্দ্রনাথের বর্ষাকে কেন্দ্র করে রচিত গানে। বিশ্বকবি বর্ষার গানে প্রেম, আকুলতা, আবাহন, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, প্রত্যাশা, উচ্ছ্বাস কিংবা মাধুর্য সবকিছুই যেন একটি শক্তিশালী মানদণ্ডে স্থাপন করেছেন। এ যেন এক শৈল্পিকতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রদর্শনও বটে।
বর্ষাকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গান রয়েছে। আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহের গীতবিতান থেকে অধিক শ্রুত গানগুলোর একটি তালিকা দিতে চেষ্টা করলাম। ব্যালকনি বা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গানগুলোর সুরের আবেদনে ঝরে পড়া ঝুম বৃষ্টির কল্পনায় হয়ত প্রিয় মানুষটিকেও কল্পনায় আসতে পারেন। ভাবতে পারেন প্রিয় মানুষটির সাথে আপনার সেই অগ্রন্থিত স্মৃতি যা আকুলতা, প্রত্যাশা বা অপূর্ণতার মুহুর্তকেও রোমন্থন করে।
বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল— রোমান্টিক ধাঁচের গানটিতে বর্ষার প্রথম কদম ফুলকে কেন্দ্র করে প্রেম ও সৌন্দর্যের অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে। আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে— বর্ষার দিনে হৃদয়ের আবেগ, আকুলতা ও প্রেমের শৈল্পিক প্রকাশ ঘটেছে গানে। আজ বারি ঝরে ঝরঝর— বর্ষার উচ্ছ্বাসিত আবেগ ফুটে উঠেছে গানটিতে। এসো শ্যামল সুন্দর— বর্ষার স্নিগ্ধ রূপকে আহ্বান জানানো হয়েছে এখানে। যা নবজাগরণ, সৌন্দর্যের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো— গানটিতে মেঘলা সন্ধ্যার আবহ ও নিস্তব্ধতার চিত্র লক্ষণীয়। যেখানে অপেক্ষা ও বিষণ্নতার আবহ প্রাধান্য পেয়েছে। গহন ঘন ছাইল— বর্ষার ঘন মেঘ ও প্রকৃতির গভীর রূপ উঠে এসেছে গানটির কথা ও বাণীতে। যেখানে প্রকৃতির মহিমা আদর্শিক রূপ ধারণ করেছে।
ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে—গানে ঝড়-বৃষ্টির শক্তিশালী ও নাটকীয় রূপ উঠে এসেছে। এখানে প্রকৃতির প্রবল শক্তিই পূজনীয়। নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে— আষাঢ়ের আকাশ ও মেঘের রূপের কাব্যিক বর্ণনা করা হয়েছে গানে। প্রকৃতিপ্রেম যেখানে মুখ্য। আজি বরিষন মুখরিত শ্রাবণরাতি— গানে শ্রাবণের রাতের আবহে প্রেম ও আবেগের প্রকাশ ঘটেছে। যেখানে প্রেম, স্মৃতি, বর্ষাকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি রূপ দেওয়া হয়েছে। মন মোর মেঘের সঙ্গী— অতি শ্রুত গানটিতে প্রেম, আবেগ ও সৌন্দর্যের রূপ উঠে এসেছে।
এছাড়াও রবীন্দ্রনাথের অসংখ্য গান বর্ষা প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে। এই গান সমূহের বাণী ও সুরের মূর্ছনা যেন বর্ষার অন্তরীত মানোজাগতিক ভাব ও আবেগকেই শৈল্পিকতার মোড়কে তুলে ধরে। যা প্রেম ও সৌন্দর্যের কেন্দ্রে স্বতস্ফূঃর্তভাবে অভিমুখী।
/এসআর