পঞ্চগড়ে মাঠে প্রতি পিস লাউ ২ টাকা, স্থানীয় বাজারে ২০, ঢাকায় এসে বিক্রি ৬০ টাকায়
পঞ্চগড় করেসপনডেন্ট
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৯ পিএম
পঞ্চগড়ে জমিতে প্রতি পিস লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২ থেকে ৩ টাকায়। অথচ স্থানীয় বাজারে সেই লাউয়ের দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা, আর রাজধানী ঢাকায় এসে সেটা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। ভালো ফলন হলেও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না কৃষক। লোকসানের মুখে পড়ে জমিতেই লাউ ফেলে দিচ্ছেন অনেকে। অন্যদিকে, কয়েক গুণ বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
দেশের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকায় লাউয়ের ভালো ফলন হয়েছে। মাঠজুড়ে গাছে গাছে ঝুলছে সবুজ লাউ। তবে ফলন ভালো হলেও দাম না থাকায় কৃষকের মুখে হাসি নেই। জমিতে মাঝারি আকারের একটি লাউ বিক্রি হচ্ছে ২ টাকায়, আর একটু বড় বা ভালো মানের লাউয়ের দাম ৩ টাকা। অথচ পাশের বাজারেই একই লাউ কিনতে হচ্ছে ২০ টাকায়।
এই দরপতনে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন জেলার আটোয়ারী উপজেলার চাষিরা। তাদের অভিযোগ, লাউ বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তো উঠছেই না, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক জমিতেই লাউ কেটে ফেলে দিচ্ছেন।
এক চাষি বলেন, লাউয়ের দাম এত কম হওয়ার কথা নয়। অথচ এখন প্রতি পিস বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ২ থেকে ৩ টাকায়।
আরেক কৃষক জানান, এক বিঘা জমিতে লাউ চাষ করতে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অথচ এ পর্যন্ত লাউ বিক্রি করে আয় হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। ফলে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে তাকে।
অন্য এক চাষির ভাষ্য, একই জমিতে ধান চাষ করলে অন্তত ১০ হাজার টাকার মতো আয় করা যেত। কিন্তু লাউ চাষ করে এখন লোকসানে পড়তে হয়েছে। আরেক কৃষক জানান, লাউ কিনতে কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বিক্রি করতে না পেরে জমির লাউ ফেলে দিতে হচ্ছে।
কৃষকের কাছ থেকে নামমাত্র দামে লাউ কিনছেন পাইকার ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। এরপর কয়েক দফা হাতবদল হয়ে সেগুলো পৌঁছাচ্ছে স্থানীয় বাজার ও শহরের খুচরা দোকানে। মাঠে আড়াই টাকায় বিক্রি হওয়া একটি লাউয়ের দাম স্থানীয় বাজারে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকায়। রাজধানীতে সেই দাম আরও বেড়ে হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা।
বাজারে বেশি দামে লাউ কিনতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ক্রেতারাও। এক ক্রেতা বলেন, দোকানে এসে প্রতিটি লাউ ২০ থেকে ২৫ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। আরেক ক্রেতার প্রশ্ন, কৃষক যখন লাউ বিক্রি করছেন, তখন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। অথচ ভোক্তাকে কিনতে হচ্ছে অনেক বেশি দামে। মাঝখানের এই দামের ব্যবধান থেকে বাড়তি অর্থ যাচ্ছে কার পকেটে?
তবে আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত লাউয়ের দাম বাড়ার পেছনে রয়েছে পরিবহন, ওঠানো-নামানো ও হাতবদলের খরচ। এক বিক্রেতা বলেন, পরিবহন ব্যয় ও কয়েক দফা হাতবদলের কারণে মাঠের দামের সঙ্গে বাজারের দামের পার্থক্য তৈরি হয়। এসব খরচ যুক্ত হয়ে একটি লাউয়ের দাম ২০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। আরেক বিক্রেতার দাবি, কয়েক হাত ঘুরে কম দামে লাউ কিনেও এবার লাভ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড়ে প্রতিবছর গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ হেক্টর জমিতে লাউয়ের আবাদ হয়। তবে উৎপাদন ভালো হলেও কৃষক কেন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাজার তদারকিতে জনবল ও প্রয়োজনীয় সহায়তার সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আব্দুল মতিন টেলিফোনে বলেন, কৃষকেরা সরাসরি বাজারে এসে পণ্য বিক্রি করতে পারলে অনেকাংশে ন্যায্যমূল্য পাবেন। এবার একসঙ্গে অনেক কৃষক লাউ চাষ করেছেন এবং একই সময়ে সবজি বাজারে আসছে। কয়েক দিনের মধ্যে বাজারে সবজির সরবরাহ কমে এলে কৃষকেরা আবার তুলনামূলক বেশি দামে লাউ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে, পঞ্চগড়ের কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মুয়ালেনা খানম জানান, তাদের দফতরে জনবল ও লজিস্টিক সহায়তার ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে দ্রুত এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
কৃষকের উৎপাদিত পণ্য মাঠে বিক্রি হচ্ছে নামমাত্র দামে, অথচ একই পণ্য কিনতে গিয়ে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি অর্থ। এই ব্যবধান কমিয়ে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার নাগালে পণ্যের দাম রাখতে কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরাসরি বিপণনব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন পঞ্চগড়ের প্রান্তিক কৃষকেরা।
/এসআইএন