সাতক্ষীরায় গণপিটুনিতে প্রাণ হারানো শামীম লিখেছিলেন ধর্মীয় বই ‘অন্তর্দৃষ্টি’
স্টাফ করেসপনডেন্ট, সাতক্ষীরা
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৯ পিএম
নবীজির ভাষায়- সকাল বেলা মুমিন সন্ধ্যাবেলা কাফির। আমরা সেই যুগে অবস্থান করছি। ঈমান রাখা হাতের মুঠে আগুন রাখার চেয়ে আরও কঠিন। তাই ঈমান অটুট রাখতে হলে কোরআন ও হাদিসের ওপর আমল করা আবশ্যক। এই কথাগুলো নিজের লেখা বইয়ে লিখেছিলেন সাতক্ষীরার দেবহাটায় ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম।
২০১৮ সালে তার লেখা বইয়ে তিনি আরও লেখেন, সৎকাজ জান্নাতের দিকে নিয়ে যায় আর অসৎকাজ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। তাই নিজেকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে হবে। নিজেকে পাহারা দেওয়ার একটি মাধ্যম কোরআন-হাদিস বেশি বেশি পাঠ করা ও আমলের পাবন্দি হয়ে যাওয়া।
পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, ওয়াহিদুজ্জামান শামীম ছিল প্রচণ্ড মেধাবী। নারায়ণগঞ্জের দেলপাড়া ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসা থেকে ফাজিল পাস। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স-মাস্টার্স করা। বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা থেকে ডি.এইচ.এম.এস. করেছে। ২০১৮ সালে ধর্মীয় একটি বই লিখেছিল শামীম, নাম দিয়েছিল ‘অন্তর্দৃষ্টি’।
সেই বইতে লেখকের দুইটি কথায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীম যা লিখেছিলেন (হুবহু তুলে ধরা হলো)।
‘আলহামদুলিল্লাহ, সকল প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য নিবেদিত, যিনি আমাদের ভালোবেসে ঈমানের মতো দৌলত দান করেছেন। কিন্তু আমাদের কর্মের কারণে ঈমান কভু আসে, কভু চলে যায়। নবীজির ভাষায়- সকাল বেলা মুমিন সন্ধ্যাবেলা কাফির। আমরা সেই যুগে অবস্থান করছি। ঈমান রাখা হাতের মুঠে আগুন রাখার চেয়ে আরও কঠিন। তাই ঈমান অটুট রাখতে হলে কোরআন ও হাদিসের ওপর আমল করা আবশ্যক। সৎকাজ জান্নাতের দিকে নিয়ে যায় আর অসৎকাজ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। তাই নিজেকে জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে হবে। নিজেকে পাহারা দেওয়ার একটি মাধ্যম কোরআন-হাদিস বেশি বেশি পাঠ করা ও আমলের পাবন্দি হয়ে যাওয়া। মন চাইলেও জিন্দেগির ওপর হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। শয়তান ওত পেতে বসে আছে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার জন্য। শয়তানের থাকার ঘর জাহান্নাম হবে আর নবীদের, সৎ মানুষের থাকার ঘর হবে জান্নাত। শয়তান সব ঘাঁটিতে তার লোক নিয়োগ দিয়েছে। যেমন- ধর্মের নামে, মাজারের নামে, ব্যবসা-বাণিজ্য, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, ব্যাংক, চাকরি ইত্যাদি স্থানে।
সে মানুষকে পথভোলা করে জাহান্নামে নিতে চায়। মানুষকে গোমরাহি করতে পারলে শয়তানের কাজ সিদ্ধ হয়ে যাবে। মানুষ যাতে পথভোলা হয়ে যায়, এ কাজে তার বিন্দুমাত্র অলসতা নেই। কিন্তু মানুষ জান্নাতে যাওয়ার কাজে একেবারেই অলস। জান্নাতে যাওয়ার রাস্তার দুপাশে কাটাযুক্ত আঁকাবাঁকা দুর্গম গিরিপথ। আর জাহান্নামের রাস্তা সোজা ও পরিষ্কার এবং সমতল নিচু ভূমির মতো, চলতে কোনো বাধা নেই। আর জান্নাতের পথে শুধু বাধা আর বাধা। তাই আমরা অলসতা ছেড়ে উঠে দাঁড়াব। কোরআন ও হাদিসের আদেশ-নিষেধ পূর্ণরূপে মেনে চললে জান্নাতে যাওয়া সহজ হবে। বইটিতে কোথাও ভুল পরিলক্ষিত হলে আমাকে জানাবেন, পরবর্তী সংস্করণে ভুল সংশোধন করে নেবো, ইনশাআল্লাহ।’
গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুই দফা গণপিটুনির শিকার হন দেবহাটা উপজেলার বড় শান্তা গ্রামের মৃত শামছুর রহমানের ছেলে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৪০)। তিনি দুই সন্তানের জনক। বড় ছেলে আইয়ানের বয়স এগারো বছর, ছোট ছেলে আরহামের বয়স আট মাস। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল ধর্ম অবমাননার।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত:
১২ অক্টোবর দুপুরে শামীমের সঙ্গে তার স্ত্রীর ঝগড়া হয়। সে সময় আশপাশের লোকজন আসে। সেই সময়ে শামীমের কিছু অসংলগ্ন কথাবার্তা অডিও রেকর্ড করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ওইদিন সন্ধ্যার পর সেই রেকর্ডের সূত্র ধরে বাড়ির পাশে বড় শান্তা বাজারে জামায়াত অফিসের ওখানে ইসলামবিদ্বেষী বুঝিয়ে মানুষদের জড়ো করা হয়। এরপর রাত সাড়ে ৮টার দিকে আমাদের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। ঘরের তালা ভেঙে ফেলা হয়। তখন শামীম ভয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে বিষপান করে বলে জানান শামীমের ছোট ভাই সাগর সানা।
দুই দফা গণপিটুনি, অংশ নেয় কারা?
১৩ অক্টোবর দুপুরে দেবহাটা উপজেলার দক্ষিণ পারুলিয়া এলাকার ফজলুল হক আমিনী শামীমের বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তুলে হত্যার উদ্দেশ্যে তৌহিদি জনতাকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়ে নিজের ফেসবুকে লাইভ করেন। তখন শামীম চিকিৎসার জন্য ছিলেন কুলিয়ার গ্রাম্য চিকিৎসক সবুরের চেম্বারে। সন্ধ্যার পূর্বে সেখানে লোকজন জড়ো করে চিকিৎসাধীন অসুস্থ শামীমকে টেনেহিঁচড়ে বের করে গণপিটুনি দেওয়া হয়। সেখানেও ফেসবুকে লাইভ করেন ফজলুল হক আমিনী। পেশায় তিনি মোটরসাইকেল ভাড়া চালান। খবর পেয়ে পুলিশ উদ্ধার করে শামীমকে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। এরপর রাত ৯টার দিকে পারুলিয়া বাস টার্মিনাল থেকে শতাধিক উত্তেজিত জনতা মিছিল নিয়ে হাসপাতালে হামলা চালায়। সেখানেও নেতৃত্ব দেন ফজলুল হক আমিনী। হাসপাতালে আরেক দফা গণপিটুনি দিয়ে চলে যায় বিক্ষুব্ধ তৌহিদি জনতা। পিটিয়ে ফেলে যাওয়ার পর মুমূর্ষু অবস্থায় পুলিশ উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেলে পাঠালে চিকিৎসক জানান, শামীম মারা গেছেন।
এদিকে, শামীম নিহত হওয়ার পর ফজলুল হক আমিনী জানিয়েছিলেন, আল্লাহ, রাসুল ও আমাদের ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে আসছিলেন। প্রতিবেশী বা তার সঙ্গে কেউ কথা বললে ইসলামবিদ্বেষী কথাবার্তা বলতেন। তৌহিদি জনতা গণপিটুনি দিয়ে তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করে দিয়েছে।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচএম শাহীন জানান, ওই মুহূর্তে আমাদের কিছু করণীয় ছিল না। আমরা পৌঁছানোর পূর্বেই হাসপাতাল ছেড়ে চলে যায় মবকারীরা।
অসংলগ্ন কথাবার্তার কারণ কী?
সুস্থ থাকাকালীন শামীম কোম্পানির চাকরি করতেন। ১২ থেকে ১৪ বছর আগে ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরার সময় অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়েন। কিছু একটা খাইয়ে দেয় শামীমকে। অচেতন অবস্থায় তাকে আমরা পাই। এরপর থেকে শামীম অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতেন। মানসিক রোগের চিকিৎসক ধীরাজ মোহনকেও দেখানো হয়। এমনকি সাতক্ষীরা শহরে ভিক্ষা করতেন। কখনও সুস্থ, আবার কখনও অস্বাভাবিক কথাবার্তা ও আচরণ করতেন। দেখা যেতো, কেউ শামীমের সঙ্গে যখন তর্কে যেতো, তখন অসংলগ্ন কথা বলতেন, উত্তেজিত হয়ে যেতেন। চিকিৎসার পর বেশ কিছু দিন সুস্থ ছিলেন। ৩-৪ বছর আগে থেকে আবারও অসুস্থ হয়ে যান বলে জানান শামীমের পরিবার।
শামীমের প্রতিবেশী সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক ওমর ফারুক জানান, শামীম ইতিহাসে অনার্স-মাস্টার্স করা একটা ছেলে। প্রচুর লেখাপড়া করতেন। ধর্মীয় বইও লিখেছেন। ইসলাম নিয়েও তার পড়াশোনা ছিল। এরপর মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েন। যেভাবে শামীমকে হত্যা করা হয়েছে, সেটি মধ্যযুগীয় বর্বরতার কথা মনে করিয়ে দেয়। মধ্যযুগীয় কায়দায় তাকে হত্যা করা হলো, এটা কেমন হলো? সে কী বলেছে, সেটা নিয়ে আমি কিছু বলব না। কিন্তু একটা প্রাণীকেও তো আমরা এভাবে মেরে ফেলতে পারি না, দিনে দুপুরে, প্রকাশ্যে, চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়। প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন কেন করেছে? এরপর আবার বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে, ফেসবুকে উল্লাস করেছে। এসবের যদি প্রতিকার না হয়, তবে আগামীতে এরকম আরও ঘটনা ঘটবে।
শঙ্কা প্রকাশ করে এই কলেজ প্রভাষক বলেন, এখন এআইয়ের যুগ। দেখা গেল, কেউ এআই দিয়ে একটি ভয়েস তৈরি করল, অথচ সেটি যাচাই-বাছাই না করেই তার ওপর মব সৃষ্টি করে মেরে ফেলল। কী হবে? শামীমের ঘটনার প্রতিকার না হলে আগামীতে নিরীহ মানুষ এই ফাঁদে বেশি পড়বে।
/এসআইএন