×
Logo

সারাদেশ

দুর্বৃত্তদের চোখ সাতছড়ি ও রেমা-কালেঙ্গায়, সাবাড় হচ্ছে বনাঞ্চল

প্রদীপ দাশ সাগর, হবিগঞ্জ

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম

দুর্বৃত্তদের চোখ সাতছড়ি ও রেমা-কালেঙ্গায়, সাবাড় হচ্ছে বনাঞ্চল

হবিগঞ্জে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে গাছ চুরির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদনও পাঠায় গোয়েন্দা সংস্থা। সেখানে বন উজাড়ের পেছনে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশের অভিযোগও উঠে এসেছে। এরই প্রেক্ষিতে ৬২ জনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করেছে বন বিভাগ। তবে মামলার এজাহারে অনেকটাই নির্বিষ হয়ে গেছে গোয়েন্দা সংস্থার গুরুতর অভিযোগ।

সবুজে ঘেরা সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল আর জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ। তবে অভিযোগ উঠেছে, এই বনাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই কাটা হচ্ছে গাছ।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলার প্রায় ২৪৩ হেক্টর বনাঞ্চলের দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন নয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বিএনপির নেতাকর্মী-বন বিভাগ জড়িত

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশেই স্থানীয় বনদস্যুরা গাছ কেটে নিয়ে যায়।

একই প্রতিবেদনে গাছ কাটা ও চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের ১২ জনের নামও রয়েছে। চোরাই গাছ কেনার সঙ্গে জড়িত চক্রের তালিকায় রয়েছে আরও আটজনের নাম। ৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

নির্দেশনার পর ২১ জুলাই অভিযুক্ত বন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সাতছড়ি সংরক্ষিত বন থেকে ১৬ মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকার গাছ অবৈধভাবে কাটা, চুরি ও বেচাকেনার অভিযোগে ২০ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করে বন বিভাগ। বাদী হন সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা।

হবিগঞ্জের সাতছড়ি বন্যপ্রাণী রেঞ্জের কর্মকর্তা মোবারক হোসেন বলেন, মামলার বিষয়টি খুবই সংবেদনশীল। এ ঘটনায় অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরে মামলা করা হয়েছে।

তবে সাতছড়ির চিত্রেই শেষ নয়। আরেক গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যেও রয়েছে একই অভিযোগ। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এসবের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। গাছ কেনার সঙ্গে জড়িত আরও আটজনের নামও উঠে আসে।

প্রতিবেদনে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশের কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা।

সিলেট বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় বন বিভাগের কারও সঙ্গে কোনো যোগসাজশ নেই। রেমা-কালেঙ্গা, রশীদপুর ও সাতছড়িসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার রেঞ্জ কর্মকর্তা, বিট কর্মকর্তা ও ফরেস্ট গার্ডরা বন রক্ষায় দিন-রাত কাজ করছেন। এমনকি তারা রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারেন না বলেও দাবি করেন তিনি।

৩০ লাখ টাকা মূল্যের গাছ কাটা ও বেচাকেনার অভিযোগ

রেমা-কালেঙ্গা থেকে গত আড়াই বছরে প্রায় ৩০ লাখ টাকা মূল্যের গাছ কাটা ও বেচাকেনার অভিযোগে ৪২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে বন বিভাগ।

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বলেন, অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা সম্ভব। তবে এই মুহূর্তে ঠিক কত টাকার ক্ষতি হয়েছে, তা হিসাব করে বলার মতো তথ্য তার হাতে নেই।

আনুমানিক কোনো হিসাব আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, অনুমান করে কোনো সংখ্যা বলা ঠিক হবে না।

তবে এ সময় চুরি হওয়া কাঠের আর্থিক মূল্য ৩০ লাখ টাকা বা এর বেশি কি না জানতে চাইলে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য বের করবে।

এদিকে, পুলিশ বলছে, মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে মামলা হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

চুনারুঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি মামলার তদন্তও চলছে। তদন্ত শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গাছ চুরির আর্থিক পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন পরিবেশকর্মীদের

এদিকে মামলার অভিযোগে গাছ চুরির আর্থিক পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশকর্মীরা। তারা বলছেন, রেমা-কালেঙ্গায় ৩৪ জন মিলে আড়াই বছরে ৩০ লাখ টাকার গাছ চুরি করলে মাসে মাথাপিছু চুরির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার টাকারও কম। আর সাতছড়িতে মাথাপিছু চুরির পরিমাণ আসে ৮ হাজার টাকা। 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা), হবিগঞ্জের সহ-সভাপতি তোফাজ্জল সোহেল বলেন, কাউকে সুবিধা দিতেই হয়তো এভাবে মামলা করা হয়েছে। গাছের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি কত হয়েছে, তা আরও ভালোভাবে যাচাই ও পর্যবেক্ষণ করে এরপর মামলা করা উচিত ছিল।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), হবিগঞ্জের সভাপতি অ্যাডভোকেট ত্রিলোক কান্তি চৌধুরী বিজন বলেন, এ ঘটনায় পাঁচজন সরকারি কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, সরকারি কর্মকর্তারাও এর সঙ্গে জড়িত। তাই বিষয়টি যেন বেশি আলোচনায় না আসে, সেজন্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম দেখিয়ে মামলা করার চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে।

প্রসঙ্গত, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান কিংবা রেমা-কালেঙ্গা, এই দুটি বনই অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। অবৈধভাবে গাছ কাটা অব্যাহত থাকলে ধ্বংস হতে পারে এই বনগুলো।

/এসআইএন





Logo