×
Logo

সারাদেশ

১০ মাস বিচারকহীন সাদুল্লাপুর সহকারী জজ আদালত, ঝুলে আছে প্রায় ৪ হাজার মামলা

গাইবান্ধা করেসপনডেন্ট

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩২ এএম

১০ মাস বিচারকহীন সাদুল্লাপুর সহকারী জজ আদালত, ঝুলে আছে প্রায় ৪ হাজার মামলা

গাইবান্ধা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আওতাধীন সাদুল্লাপুর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে প্রায় ১০ মাস ধরে স্থায়ী বিচারক না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো বিচারপ্রার্থী।

গত বছরের নভেম্বরে বিচারক বদলির পর থেকেই এ সংকটের সৃষ্টি। আদালতটিতে দেওয়ানি, পারিবারিক ও ভূমি বিরোধসহ প্রায় ৪ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন আদালতসংশ্লিষ্ট ও আইনজীবীরা।

বিচারক সংকটে এসব মামলার অধিকাংশের কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। নির্ধারিত তারিখে আদালতে এসে অনেক বাদী-বিবাদীকে শুধু হাজিরা দিয়ে পরবর্তী তারিখ নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। এতে মামলার দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি বাড়ছে সময়, অর্থ ও মানসিক ভোগান্তি।

আদালত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিচারকের পদ শূন্য থাকলেও স্থায়ীভাবে বিচারক নিয়োগে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। অতিরিক্ত দায়িত্বে বিচারক থাকলেও নিজ আদালতের কাজের চাপ থাকায় সাদুল্লাপুর আদালতের মামলাগুলোর নিয়মিত শুনানি ও নিষ্পত্তি ব্যাহত হচ্ছে।

আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাদুল্লাপুর সহকারী জজ আদালতের বিচারক আবু রায়হান বদলি হয়ে কুড়িগ্রাম জেলা জজ আদালতে যোগদানের পর আদালতটিতে স্থায়ী বিচারকের সংকট তৈরি হয়। এর আগে দায়িত্বে থাকা সহকারী জজ আবু তাহের প্রশিক্ষণজনিত কারণে বাইরে থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকের মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।

পরবর্তীতে একাধিক বিচারককে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হলেও নিয়মিত শুনানি ও মামলার অগ্রগতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে হয়নি বলে অভিযোগ বিচারপ্রার্থীদের। বর্তমানে পলাশবাড়ী সহকারী জজ আদালতের বিচারক সাদুল্লাপুর আদালতের অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

আদালত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনের কার্যতালিকায় ৩০ থেকে ৪০টি পর্যন্ত মামলার শুনানি নির্ধারিত থাকে। এসব মামলার মধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ, সমন জবাব, যুক্তিতর্ক, নিষেধাজ্ঞা, বাটোয়ারা, পারিবারিক বিরোধ, ভরণপোষণ ও ভূমি সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। কিন্তু স্থায়ী বিচারক না থাকায় অনেক মামলায় কার্যকর শুনানি না হয়ে হাজিরা, পিটিশন গ্রহণ ও পরবর্তী তারিখ নির্ধারণের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকছে।

এর ফলে সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে থাকা মামলা সেখানেই পড়ে থাকছে, যুক্তিতর্কের মামলাতেও শুনানি হচ্ছে না। জরুরি নিষেধাজ্ঞা বা অন্যান্য অন্তর্বর্তীকালীন বিষয়েও সিদ্ধান্ত পেতে দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের।

দীর্ঘদিনের ভোগান্তির প্রতিকার চেয়ে গত ২৮ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন সাদুল্লাপুর উপজেলার বাসিন্দা ফিহাদ সরকার।

আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, জেলা জজ আদালতের তৃতীয় তলার ৩০২ নম্বর কক্ষে পরিচালিত সিনিয়র সহকারী জজ আদালতটি সাদুল্লাপুর উপজেলার দেওয়ানি, পারিবারিক ও ভূমি সংক্রান্ত মামলার বিচারপ্রার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রায় ১০ মাস ধরে সহকারী জজের পদ শূন্য থাকায় বিচারিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফিহাদ সরকারের দাবি, অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকের নিজ আদালতের কাজের চাপ থাকায় সাদুল্লাপুর আদালতের মামলাগুলোর নিয়মিত শুনানি হচ্ছে না। এতে হাজারো বিচারপ্রার্থী ন্যায়বিচার পেতে দীর্ঘসূত্রতার শিকার হচ্ছেন।

আবেদনে তিনি আদালতের জুডিশিয়াল হেল্পলাইন নম্বর দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করেন। তার অভিযোগ, মামলার তথ্য জানতে ও কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নিতে বিচারপ্রার্থীদের আরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

ফিহাদ সরকার বলেন, 'দুই-চার মাস নয়, প্রায় ১০ মাস ধরে আদালতে স্থায়ী বিচারক নেই। একটি মামলায় শুনানি হবে— এমন প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে আদালতে আসছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই শুধু হাজিরা দিয়ে পরবর্তী তারিখ নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। এতে মাসের পর মাস আইনজীবী-মুহুরি ও যাতায়াতের পেছনে টাকা খরচ করতে হচ্ছে।'

আদালতে আসা বিচার প্রত্যাশী সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দা আসমা বেগম প্রায় দুই বছর আগে পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগে এ আদালতে মামলা করেন। তিনি বলেন, মামলা শুরুর দিকে বিচারক থাকায় কার্যক্রম এগিয়েছিল। পরে বিচারক না থাকায় মামলার অগ্রগতি থেমে গেছে।

আসমা বেগম বলেন, 'মামলা নিয়ে আদালতে আসছি, হাজিরা দিচ্ছি, আবার পরবর্তী তারিখ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবার আসতে যাতায়াত ও আইনজীবীর পেছনে টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু মামলার কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।'

ভরণপোষণের মামলার আরেক ভুক্তভোগী রোজিনা খাতুন বলেন, আদালতের আদেশে একবার ভরণপোষণের টাকা পেলেও পরে তা নিয়মিত পাননি। শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে তাকে বারবার আদালতে আসতে হচ্ছে। তিনি বলেন, 'শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে মামলার তারিখে আদালতে আসি। কিন্তু বিচারক না থাকায় শুধু হাজিরা দিয়ে বাড়ি ফিরে যাই। মাসের পর মাস নতুন বিচারক বসছেন না। দ্রুত বিচারক নিয়োগ করা হলে আমাদের মতো বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি অনেকটা কমবে।'

ভূমি বিরোধ সংক্রান্ত একটি বাটোয়ারা মামলার বাদীপক্ষের ভুক্তভোগী ৭০ বছর বয়সী খোদেজা বেগম। তার অভিযোগ, প্রায় ২০ বছর ধরে তাদের মামলা আদালতে চলছে। অপর পক্ষও ২০০৪ সালে পৃথক বাটোয়ারা মামলা করে। দুই মামলাই প্রায় দুই দশক ধরে চলমান। তিনি জানান, একটি মামলা সাক্ষ্য গ্রহণ এবং অন্যটি যুক্তিতর্ক পর্যায়ে রয়েছে। গত ১০-১১ মাসে একাধিক তারিখ পড়লেও বিচারক না থাকায় সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্কের কার্যক্রম এগোয়নি। একটি মামলার পেছনে বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে হচ্ছে।' 

সাদুল্লাপুর উপজেলার বাসিন্দা নুরুল আমিন মণ্ডল ২০২৪ সালে জমির দলিল সংশোধনের মামলা করেন। তার ভাষ্য, মামলাটি প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও গত সাত-আট মাস ধরে শুনানির জন্য আদালতে ঘুরছেন। তিনি বলেন, 'মামলার আর মাত্র দুটি ধাপ বাকি। কিন্তু সাত-আট মাস ধরে সকালে আদালতে যাচ্ছি, বিকেলে ফিরে আসছি। আদালতে গেলে বলা হয়—বিচারক নেই, পরের তারিখে আসেন। এভাবে মাসের পর মাস কেটে যাচ্ছে, কিন্তু সেই অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না।' 

ইদিলপুর গ্রামের আঞ্জুয়ারা বেগমও পারিবারিক বিরোধের একটি মামলায় আদালতে যাতায়াত করছেন। তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন কার্যকর শুনানি না হওয়ায় তিনি ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির মধ্যে রয়েছেন। এমন ভোগান্তি আর ক্ষতির বিষয় আগে বুঝতে পারলে আদালতে মামলা করতে আসতাম না।'

বিচারক সংকটে শুধু বিচারপ্রার্থী নন, আইনজীবীরাও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ভূমি বিরোধ সংক্রান্ত বাটোয়ারা ও স্বত্বঘোষণার দুটি মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট অমল কুমার দাস বলেন, মামলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলতে চলতে বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষেরই মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে গত মে মাসে একজন বাদী মারা যান। পরে তার ডেথ সার্টিফিকেট ও ওয়ারিশান সনদ আদালতে দাখিল করা হয়েছে।

তিনি বলেন, 'মামলা দুটির একটি সাক্ষ্য গ্রহণ ও অপরটি যুক্তিতর্ক পর্যায়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আদালতে বিচারক না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের শুনানি এগোচ্ছে না। প্রতিটি আদালতে নিয়মিত বিচারক থাকা জরুরি। সাক্ষ্য গ্রহণ, যুক্তিতর্ক ও রায় ঘোষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক কার্যক্রম বিচারক ছাড়া সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।'

গাইবান্ধা বারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আশরাফুল আলম রঞ্জু বলেন, 'জেলার বিভিন্ন আদালতে বিচারক সংকটের কারণে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি বাড়ছে। বিশেষ করে সাদুল্লাপুর সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানি, পারিবারিক, যৌতুক, ভরণপোষণ ও ভূমি বিরোধের মামলার দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। নতুন বিচারক নিয়োগ করা হলে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি অনেকটা কমবে।'

আদালতটির অফিস সহকারী আনিছুর রহমান জানান, প্রায় ১০ মাস ধরে আদালতে নিয়মিত বিচারক নেই। বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক রয়েছেন। তিনি বলেন, 'আদালতে প্রায় ৪ হাজার মামলা চলমান। কার্যদিবস ও ধার্য তারিখ অনুযায়ী প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি পর্যন্ত মামলার শুনানি তালিকায় থাকে। কিন্তু নিয়মিত বিচারক না থাকায় এসব মামলার অধিকাংশের কার্যকর শুনানি হচ্ছে না। বাদী-বিবাদীরা প্রয়োজনীয় হাজিরা ও পিটিশন দিয়ে চলে যাচ্ছেন। 

বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের মতে, দেওয়ানি, পারিবারিক ও ভূমি সংক্রান্ত মামলায় এমনিতেই দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। তার ওপর দীর্ঘদিন বিচারক না থাকায় মামলার জট আরও বাড়ছে। নিয়মিত শুনানি না হওয়ায় সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদের মানসিক চাপও বাড়ছে। তাদের দাবি, সাদুল্লাপুর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে দ্রুত একজন স্থায়ী বিচারক নিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মামলাগুলোর শুনানি ও নিষ্পত্তি ত্বরান্বিত করতে কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

বিচারপ্রার্থীদের ভাষায়, আদালতে মামলা করে যদি বছরের পর বছর শুধু হাজিরা আর পরবর্তী তারিখের অপেক্ষায় থাকতে হয়, তাহলে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও দীর্ঘ হয়ে যায়। তাই প্রায় ১০ মাসের বিচারক সংকটের অবসান ঘটিয়ে দ্রুত নিয়মিত বিচারিক কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।

/এমএইচআর

Logo