রংপুরে আদালত চত্বরে তুলকালাম কাণ্ড, আইনজীবীদের মধ্যে মারামারি-হাতাহাতি
রংপুর ব্যুরো
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম
ভোটাধিকার হরণসহ আইনজীবি সমিতির কালাকানুন বাতিলের দাাবি নিয়ে নতুন আইনজীবীদের সাথে সমিতির সদস্যদের মারামারি, হাতাহাতি ও বিক্ষোভসহ নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে রংপুর আদালত চত্বরে। এসময় একজন সাংবাদিককে মারধর ও ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া হয়। দিনভর উত্তেজনা শেষে সন্ধ্যায় নতুন আইনজীবীদের দাবি মেনে নেয় সমিতি।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টা থেকেই রংপুর কোর্ট চত্বরে ভোটাধিকার না রাখতে মুচলেকা ও অতিরিক্ত ফি আদায়সহ বিভিন্ন কালাকানুন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন নতুন আইজীবিরা।
এদিন বেলা ১টার পর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতাব হোসেন অতিরিক্ত ফি এবং মুচলেকা বাদ দিয়েই নতুন আইনজীবীদের সমিতিতে ভর্তি করার নির্দেশ দিলে আন্দোলন কিছুটা প্রশমিত হয়।
এরইমধ্যে বেলা ৩টার পর সমিতির সভাপতি শাহেদ কামাল ইবনে খতিব আদালত চত্বরে এসে নতুন আইনজীবীদের ভর্তি বন্ধ করে দিলে তুমুল উত্তেজনা তৈরি হয়। নতুন আইনজীবীরা আবারও বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের সাথে যোগ দেন বিএনপি ও জামায়াতপন্থি আইনজীবিরাও। এসময় তারা আইনজীবী সমিতিকে আওয়ামী দালাল মুক্ত করার দাবিকে স্লোগান দিতে থাকেন। পরে তারা গিয়ে শাহেদ ইবনে কামালের চেম্বার ঘিরে ধরেন। সেখানে দুইপক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি হতে থাকে।
এরইমধ্যে খবর সেখানে উপস্থিত হন রংপুর উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু এবং সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম মিজুসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। তারা আইনজীবী সমিতির সাথে কথা বলার জন্য নতুন আইনজীবী জেবুন্নেসা জেবু দিয়ে খবর পাঠান সমিতির সভাপতি সাধারণ সম্পাদকের কাছে। এসময় জেবুন্নেসা সেখানে গিয়ে সমিতির কার্য নির্বাহী সদস্য সিধাংশুকে খবরটি দিতে থাকলে তিনি জেবুন্নেসাকে থাক্কা মারেন। এনিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে।
নতুন আইনজীবীরা সিধাংশুকে ধাওয়া করে তাকে উত্তম-মধ্যম দেয়। এর প্রতিবাদ করেন পুরোনো আইনজীবীরা। পরে সিধাংশুকে সেখান থেকে নিয় যান তারা। এ নিয়ে চরম উত্তেজনা তৈরি হয় সেখানে। সিধাংশুর বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করতে থাকেন নতুন আইনজীবীরা। এরই মধ্যে মহানগর যুবদল-ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও আদালতে মিছিল নিয়ে প্রবেশ করেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সামসুজ্জামান সামু সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক করেন। পরে আইনজীবী সমিতি ভোটাধিকার হরণ সংক্রান্ত মুচলেকা ছাড়াই ১০ ভাগ অতিরিক্ত ফি দিয়ে নতুন আইনজীবীদের ভর্তির জন্য সমঝোতা হয়। পরে সন্ধা ৬টা থেকে আবাও ভর্তি কার্যক্রম শুরু হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি কার্যক্রম চলবে বলে জানিয়েছে সমিতি।
হামলার শিকার নতুন আইনজীবী জেবুন্নেছা জেবু জানান, ‘সামু ভাই যখন আইনজীবী সমিতির সদস্য সিধাংশূকে ডাকেন, তিনি শুনছিলেন না। তখন আমি সিধাংশুকে বলি ভাই ডাকতেছে। তখন সে আমার কথায় উত্তেজিত হয়ে আমাকে ধাক্কা দেয় এবং আমাকে পা দিয়ে খচিয়ে মেরে ফেলার চেস্টা করে। বিপুল ভাই যদি আমাকে না বাঁচাতো তাহলে আজকে আমি মরেই যেতাম। তিনি বলেন, আমিরা কেন ভোটাধিকার হরণের মুচলেকা দিবো। মানুষ ভোটের জন্যই সব কিছু করে। আমরা ভোটার হবো না বলে সমিতিকে মুচলেকা দিবো। এটা কখনই হবে না। আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে।’
নতুন আইনজীবী বলেন, বিএনপি সরকারের আমলেও যোগসাজসভাবে সমিতির সভাপতি একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে বিএনপি-জামায়াতপন্থী আইনজীবীদের কোনঠাসা করতে চাচ্ছে। সেসময় বিএনপিপন্থী সাধারণ সম্পাদককে কোনঠাসা করে রাখতে চায়। সে ধমক দিয়ে কথা বলে সব সময়। আজকে তার গুন্ডা সিধাংশু জেবা আপার ওপর হামলা করেছে। আমরা এর বিচার চাই। কালাকানুন সব বাতিল চাই।
আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে অংশ নেয়া জাতীয়তাবাদি আইনজীবি ফোরামের সদস্য সচিব শফি কামাল বলেন, ‘ রংপুর আইনজীবি সমিতিতে কালাকানুন চলে আাস তেছে।এখানে কেউ ভোটাধিকার পাবে কেউ ভোটাধিকার পাবে না। এই ভোটারাধিকারের জন্য বাংলার মানুষ দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন করেছে। সেই ভোটাধিকার হরণ হচ্ছে সমিতিতে। নতুন আইনজীবিদের এখানে কারো ৫ লাখ কারো ৬ লাখ কারো দিন লাখ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে টাকা নিয়ে ভর্তি করতেছে। তারা ভর্তিও হবে ভোটাধিকারও পাবে না। এজন্য নতুন আাইনিজীবিরা আন্দোলন করতেছে। এটা নিয়ে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সাধারণ সম্পাদক আফতাব হোসেন মুচলেকা বাদ দিয়ে এবং নির্ধারিত ফি দিয়ে ভর্তির নির্দেশ দিলে দুপুর থেকে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু সভাপতি আওয়ামীলীগ নেতা শাহেদ ইবনে খতিব ও তার লোকজন গিয়ে সাধারণ সম্পাদকের ওপর মব সৃষ্টি করে আদেশ উইথড্রো করার জন্য চাপ দিয়ে ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এনিয়ে এখানে বিএনপি নেতৃবৃন্দ আসেন। এরই মধ্যে একজন নতুন আইনজীবিকে সমিতির সদস্য সিধাংশু ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়।
রংপুর আইনজীবি সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতার হোসেন জানান, ‘ নতুন আইনজীবিদের আন্দোলনের মুখে আমি ভোটাধিকার সংক্রান্ত মুচলেকা না নিয়েই ভর্তি হওয়ার নির্দেশনা দেই। কিন্তু আমি সভাপতিসহ অন্যান্যদেরন মবের শিকার হই।’
রংপুর আইনজীবি সমিতির সভাপতি শাহেদ কামাল ইবনে খতিব জানান,‘ সাধারণ সম্পাদকের ওপর মব তৈরি কিংবা নতুন আইনজীবিকে ধাক্কা মারার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আপনারা তদন্ত করেন।’
এ ব্যপারে রংপুর উন্নয়ন কতৃপক্ষের জেযারম্যান সামসুজ্জামান সামু বলেন, ভোটাধিকার হরণে মুচলেকাসহ বিভিন্ন বিষয় সমিতি কালাকানুন করেছে। এর বিরুদ্ধেই আইনজীবিদের আন্দোলন। এখানে নতুন পুরোনো মিলে ৮০ ভাগ আইনজীবি এই কালাকানুনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে। ওরা সদস্য হওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। তাদের আন্দোলনের মুখে ওরা সদস্য ভর্তি নেয়া শুরু করতে বাধ্য হলো। আমরা বসে বাকি কালাকানুনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালে বার কাউন্সিল থেকে ১০৮ জন নতুন আইনজীবি রংপুর থেকে লাইসেন্সভুক্ত হয়।
/এমএইচআর