×
Logo

সারাদেশ

মায়ের পেনশন তোলার বাজে অভিজ্ঞতা থেকে ‘ঘুষ সাইট’, ৩৩৪ কোটি টাকার অভিযোগ

ময়মনসিংহ ব্যুরো

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম

মায়ের পেনশন তোলার বাজে অভিজ্ঞতা থেকে ‘ঘুষ সাইট’, ৩৩৪ কোটি টাকার অভিযোগ

মাত্র ১০ দিন আগে ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) নামের একটি ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়। এখন পর্যন্ত (সোমবার সকাল ১০টা পর্যন্ত) ৯ হাজার ৯২৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের মোট পরিমাণ ৩৩৪ কোটি টাকা।

কিন্তু কেন এই সাইট খোলা হয়েছে? এমন প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই এর প্রতিষ্ঠাতা ১৭ বছরের কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদ দিয়েছে। তার দাবি, মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে ঘুষের বাজে অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হয়েছিল। এমনকি নিজের পাসপোর্ট তৈরির সময়ও একই অভিজ্ঞতায় পড়তে হয় তার। সেজন্য ভারতীয় একটি ঘুষবিরোধী ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই সাইটটি তৈরি করা হয়।

সে ময়মনসিংহের সানকিপারায় একটি ভাড়া বাসায় বাবার সঙ্গে থাকে। বর্তমানে ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীন কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়াশোনা করছে। তার বাবা শরীফুল ইসলাম (শামীম) আগে সৌদি আরবের একটি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। শাহেদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বপাড়া এলাকায়। তার মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর শারীরিক অসুস্থতায় তিনি মারা যান।

ঘুষসাইট কী, যেভাবে কাজ করে

ঘুষসাইট হলো একটি উদ্ভাবনী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যা বাংলাদেশে প্রচলিত দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ ও প্রচারের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এখানে নাগরিকরা সম্পূর্ণ বেনামে বিভিন্ন সরকারি দফতরে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা বা দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ নথিভুক্ত করতে পারেন। সিস্টেমটি কোনো ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ না করে শুধুমাত্র অনিয়মের ধরন ও প্রবণতা উন্মোচনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে।


পাবলিক লেজারের মাধ্যমে এই সাইটটি ভূমি অফিস, পাসপোর্ট বা বিআরটিএ’র মতো খাতে দুর্নীতির বাস্তব চিত্র ও পরিসংখ্যান জনসমক্ষে তুলে ধরে। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো, জনসাধারণের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি স্বচ্ছ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা, যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে সহায়তা করবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা সাধারণ মানুষ যাতে নির্দিষ্ট দফতরের অনিয়মের মাত্রা ও গভীরতা বুঝতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এটি ডিজাইন করা হয়েছে।

শীর্ষে কোন সরকারী দফতর ও বিভাগ

ওয়েবসাইটিতে ঘুষের অভিযোগের ক্ষেত্রে দেশের ভৌগোলিক বা প্রশাসনিক বিভাগ (যেমন: ঢাকা, চট্টগ্রাম) এবং অন্যটি সরকারি কাজের নির্দিষ্ট খাত বা দফতর (যেমন: ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিস) হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

শীর্ষে কোন সরকারী দফতর ও বিভাগ

ওয়েবসাইটটির বানানোর নেপথ্যের গল্প

শাহেদ জানায়, অসবর প্রাপ্ত শিক্ষিকা মায়ের মৃত্যুর পর পেনশনের প্রায় ১০-১২ লাখ টাকা তুলতে সরকারি অফিসে গেলে এক কর্মকর্তা ঘুষ দাবি করেন। শুধু মায়ের পেনশন নয়, নিজের পাসপোর্ট তৈরির সময়ও ঘুষের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় সে। ও-লেভেল পরীক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট করতে গিয়ে কয়েকদিন আটকে থাকার পর ঘুষ দেওয়ার দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যেই পাসপোর্ট হাতে পায় বলে জানায় সে।

মূলত, এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকেই বাংলাদেশে ঘুষ লেনদেনের তথ্য স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার চিন্তা করে শাহেদ। ভারতীয় একটি ঘুষবিরোধী ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে তৈরি করে সাইটি। পরে সহপাঠী সাইফের সহযোগিতায় সাইটটি চালু করা হয়।

শাহেদ জানায়, মাত্র ১০ দিনে সাইটটিতে প্রায় ১০ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে দাবি করা ঘুষের পরিমাণ প্রায় ৩৩৪ কোটি টাকা। বর্তমানে মডারেশন টিম অভিযোগগুলো যাচাই করছে।

তবে আইনি ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে আপাতত অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না। ভবিষ্যতে আইনি সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন পেলে তথ্য আরও বিস্তৃতভাবে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানায় শাহেদ।

মূলত, এই প্ল্যাটফর্মের উদ্দেশ্য কাউকে হয়রানি করা নয়; বরং কোথায়, কোন খাতে ঘুষ বেশি হচ্ছে, তার একটি স্বচ্ছ চিত্র তৈরি করা। এসব তথ্য ব্যবহার করে প্রশাসনও দুর্নীতির ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে পারবে বলে জানায় শাহেদ।

সাইটি পরিচালনায় এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। তার দীর্ঘদিনের ফুলস্ট্যাক ডেভেলপার হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে এই উদ্যোগে।

তবে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনার পাশাপাশি সাইট পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলেও জানায় সে। ভবিষ্যতে সরকারি বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পেলে এটি আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নেওয়ার আশা।

/এসআইএন


Logo