টেস্ট হয় না মোড়েলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে; যেতে হয় কর্মকর্তার ল্যাবে
হাসান মিসবাহ, ইয়ামিন আলী
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:২০ পিএম
পাঁচ লাখ মানুষের উপজেলা মোড়েলগঞ্জ। বাগেরহাটের এই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব বাগেরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর।
কোনো ধরনের টেস্ট-পরীক্ষা হয় না এই সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এমনকি ল্যাবের সরঞ্জামও সব নেই। অথচ বছর-বছর কেনা হয়েছে পরীক্ষার রিএজেন্ট। বন্ধ অপারেশন থিয়েটারও। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে হাসপাতালের সীমানা প্রাচীর ঘেঁষেই ব্যক্তিগত ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. কামাল হোসেন মুফতি। সেখানেই হয় রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা।
এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে লেখা সেনিটারি ইন্সপেক্টর। সম্প্রতি সেখানে যাওয়া হলে তালা খুলে ভেতরে গিয়ে দেখা যায় ল্যাবের কিছু যন্ত্রপাতি। যেখানে ল্যাব বসানোর প্রস্তুতি চলছে।
এখন পর্যন্ত ল্যাব না থাকলেও হাসপাতালের ফ্রিজে পাওয়া গেল কিছু রিএজেন্ট। কোনোটির মেয়াদ প্রায় শেষ। আর কিছু নতুন কেনা। সর্বশেষ দুই লাখ ৪৩ হাজার টাকার রিএজেন্ট কেনা হয়েছে।
এছাড়া, অনেক রিএজেন্টের মেয়াদ শেষ বলে দাবি করলেও সেগুলো দেখাতে পারেননি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। দুই দিন অপেক্ষার পরও তালা খুলে দেননি স্টোরের। তাই প্রশ্ন উঠেছে, রিএজেন্ট কি সেখানে আদৌ আছে?
ভবনের কোনও কক্ষ খুলে না দিলেও জানালা দিয়ে দেখা যায়, এই কক্ষে লাখ লাখ টাকার মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ। যার মধ্যে আছে অ্যান্টিবায়োটিকসহ অনেক জীবন রক্ষাকারী ওষুধও। আছে এনসিডি কর্নারের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং শিশুদের মেডিসিন। অথচ এই হাসপাতালে আসলে ওষুধ পায় না সাধারণ রোগীরা।
শুধু প্যাথলজি নয়, অন্য কোনো পরীক্ষাও হয় না এই হাসপাতালে। আবাসিক চিকিৎসকের কক্ষে ঢেকে রাখা হয়েছে আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন। হয় না ইসিজি, এক্সরে সেবা বন্ধ ১০ বছর ধরে।
৫০ শয্যার এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন রোগী আসেন তিনশ থেকে সাড়ে তিনশ। রোগী ভর্তি আছে ২০ জন। তাহলে তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় কোথায়?
হাসাপাতালে আসা রোগীরা জানালেন, তারা ডা. কামাল হোসেন মুফতির ক্লিনিকে টেস্ট-পরীক্ষা করিয়েছেন।
এ নিয়ে ডা. কামাল হোসেন মুফতিকে প্রশ্ন করা হলে দাবি করেন, হাসপাতালের পাশের ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি তার নয়। এটি অন্যদের, তিনি কেবল সেখানে চেম্বার করেন।
ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কোথাও নাম লিখা নাই। যেখানে জরুরি সব টেস্টই হয়। সেখানে যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদক গেলে ল্যাবের সবাই গা ঢাকা দেয়। ডায়াগনস্টিকের কর্মচারীও নিজেকে রোগী পরিচয় দেন।
যার কিছুক্ষণ পর চিকিৎসক আসেন। তিনি মোড়েলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেই প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কামাল হোসেন মুফতি। এই প্রতিষ্ঠানের মালিক কে জানতে চাইলে ক্ষেপে যান তিনি এবং তার ক্লিনিক না বারবার বলতে থাকেন।
একপর্যায়ে তার কর্মচারী ও ভাড়াটে লোক দিয়ে মব তৈরি করেন। উসকে দেন রোগীদেরও। এর মধ্যে সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্য সহকারী ফারুক হোসেন নামে এক ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ভিডিও করতে থাকেন। যা পরে মিথ্য তথ্য দিয়ে আপলোড করা হয় অনলাইনে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম ফ্যামিলি হেলথ ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। নিজেকে আড়াল করতে এটির লাইসেন্স করা হয়েছে ডা. কামাল হোসেন মুফতির ভাই জাকির হোসেনের নামে। তবে লাইসেন্সে ফোন নম্বর ও ইমেইল অ্যাড্রেস দেওয়া হয় ডা. কামাল হোসেন মুফতির। এই ডায়াগনস্টিকের লাইসেন্সের মেয়াদও শেষ হয়েছে ২ বছর আগে।
এই চিকিৎসকের সাবেক স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তানিয়া জানালেন, তার নামেই এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স হাওয়ার কথা ছিল। তবে তার সাথে ডিভোর্স হয়ে যাওয়ায় ভাইয়ের নামে হয়েছে।
একটি উপজেলায় অবৈধ হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে কি না, তা দেখার অন্যতম দায়িত্ব উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার নিজের প্রতিষ্ঠানেরই লাইসেন্সের মেয়াদ নেই।
বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. মাহবুবুল আলম জানালেন, তারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাগজপত্র যাচাই করে দেখবেন। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন। অফিস চলাকালীনও ডা. কামাল হোসেন মুফতি প্রাইভেট প্র্যাকটিস করার কথা শুনেছেন তিনি। এছাড়া, মালামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে কিছু ঝামেলা থাকলে থাকতে পারে।
এখানেই কেবল শেষ নয়, ডা. কামাল হোসেন মুফতির বিরুদ্ধে অভিযোগ, হাসপাতালের কোয়ার্টারে বসেই ৪০০ টাকা ভিজিট নিয়ে রোগী দেখতেন। অস্ত্রোপচার করেও নিতেন টাকা।
এ নিয়ে তাহমিনা আক্তার তানিয়া জানান, সকাল ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত রোগী দেখতেন এই চিকিৎসক। ১০টা বেজে গেলে পরে হাসপাতালে গিয়েও পিয়নের মাধ্যমে টাকা নিয়ে রোগী দেখতেন।
কয়েকজন রোগীও একই কথা জানালেন যমুনা টেলিভিশনকে।
জানা গেছে, মোড়েলগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থেকে যমুনা টেলিভিশনের প্রতিবেদক ফিরে আসার পর তড়িঘড়ি করে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালু করেন ডা. কামাল হোসেন মুফতি। সেগুলো আবার কিছু গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারও করেন। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে সেই পরীক্ষা আগে কেন চালু করেননি তিনি?
/এমএন