×
Logo

সারাদেশ

সরেজমিন বগুড়ার শিবগঞ্জ

প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর সম্পদ বৃদ্ধি শাহে আলমের, উন্নয়ন বরাদ্দে খুশি এলাকার লোকজন

আখলাকুস সাফা

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ১২:৩২ পিএম

প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর সম্পদ বৃদ্ধি শাহে আলমের, উন্নয়ন বরাদ্দে খুশি এলাকার লোকজন

অন্তর্বর্তী সরকারের পর গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে বিএনপি সরকার। নবগঠিত সরকারের স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মীর শাহে আলম। দায়িত্ব নেওয়ার পর গত তিন মাসে বগুড়ার শিবগঞ্জে বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ, প্রতিমন্ত্রীর নামে ২৪২ শতক জমি ক্রয় নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এছাড়াও তিনটি ইউনিয়নের নামকরণের ক্ষেত্রেও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

এসব অভিযোগের বিষয় নিয়ে সরেজমিনে বগুড়ার শিবগঞ্জে অনুসন্ধান করেছে যমুনা টেলিভিশন। তবে প্রতিমন্ত্রীর দাবি, জমিগুলো তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কেনা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। 

বগুড়ার নতুন উপজেলা মোকামতলার লস্করপুর কাশিপুর মৌজার ২৪২ শতকের জমির মালিকের খোঁজ করলে স্থানীয়রা জানান, এই জমির মালিক মীর শাহ আলম। তাদের দাবি, সামনে আরও জমি কিনবেন প্রতিমন্ত্রী।

বর্তমানে এই জমির বাজার মূল্য শতক প্রতি আড়াই লাখ টাকা। স্থানীয় মঞ্জুর রায়হান রোজের কাছ থেকে এই জমি কেনা হয় ৬ কোটি টাকায়। এপ্রিলের শেষদিকে জমিটি কেনা হয়েছে প্রতিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় মীর শাহ আলমের নামে।

স্থানীয়দের দাবি, জমিটির মূল মালিক মারা যাওয়ার পর তার ছেলের দখলে ছিল। পরে হঠাৎ করেই তারা জানতে পারেন, জমিটি বিক্রি হয়ে গেছে। তাদের ভাষ্যমতে, মীর শাহে আলম জমি কিনেছেন।

তাদের তথ্যমতে, মূল জমির পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে সাত বিঘা। এছাড়াও প্রধান সড়ক পর্যন্ত সংযোগের জন্য আরও প্রায় আড়াই বিঘা জমি কেনা হয়েছে। সব মিলিয়ে জমির মোট পরিমাণ প্রায় ১০ বিঘা।

এদিকে, বগুড়ার শিবগঞ্জে একটি হেলিপ্যাড বানানো হয়েছে। যার খরচ ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। জেলা পরিষদের অনুকূলে বিশেষ বরাদ্দে হচ্ছে এই হেলিপ্যাড। ৪ জুন এ বরাদ্দ দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিমন্ত্রীর হেলিকপ্টার অবতরণের সুবিধার্থে এ রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। তাদের দাবি, এখানে একটি অফিসঘর নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট লোকজনের থাকার ব্যবস্থাও করা হবে।

মহাস্থানে হজরত শাহ সুলতান বলখী রহমতুল্লাহ আলাইহির মাজার। নারী মুসল্লিদের বিশ্রামের জন্য সেখানে শেড নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন প্রতিমন্ত্রী ও মাজার কমিটির উপদেষ্টা মীর শাহে আলম। সেজন্য জেলা পরিষদ থেকে বরাদ্দ করান ৭৪ লাখ টাকা। অথচ সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় যে কোনো ধরনের স্থানীয় অবকাঠামো নির্মাণে প্রত্নতত্ত্বের আপত্তি, আর বিষয়টি গণমাধ্যমে চলে আসায় এখন সেই কাজটি বন্ধ হয়ে গেছে।

স্থানীয় একজন বলেন, আগে এখানে 'পাগল-পাগলি'র থাকার ব্যবস্থা ছিল। এছাড়াও হঠাৎ করে আসা আবাসিক লোকজনেরও থাকার জায়গা না থাকলে তাদের এখানে থাকার ব্যবস্থা করা হতো।

আরেকজন বলেন, প্রতিমন্ত্রী জানেন এখানে কাজ হবে। তবে প্রকল্পটির নকশা সম্পর্কে হয়তো জেলা পরিষদের কাছেই তথ্য আছে। ঠিকাদার যারা কাজ করছেন, তারাও বিষয়টি ভালো বলতে পারবেন।

অন্যদিকে, প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা শিবগঞ্জে নির্মাণ হচ্ছে উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম, নারী-পুরুষের জন্য আলাদা ক্রীড়া একাডেমি। যেসব রাস্তা এতদিন ছিল আধা কাঁচা, সেগুলোর ইটের সলিংয়ের কাজে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ কোটি টাকা। যদিও এলাকার স্থানীয়দের দাবি, লেয়ারের পেছন দিয়ে গাড়ি নেওয়া যায় না। তাই সেখানে ঢালাই করে পাকা করে দেওয়াই উত্তম। তা না হলে যানবাহন উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে গাড়ি চলাচলেও আরও বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

বগুড়ার মোট বরাদ্দের অর্ধেকেরও বেশি ৭৪ কোটি টাকার প্রকল্প শুধু প্রতিমন্ত্রীর উপজেলা শিবগঞ্জে গেছে। এমনকি ঘুরেফিরে ঠিকাদারির কাজ পেয়েছে তার ছেলেসহ নিকটজনেরাই বলেও অভিযোগ উঠেছে।

একজন বলেন, অনেকেই কাজ করছেন। তবে সবাইকে যে জোর-জুলুম করা হয়, বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু তাদের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করার সুযোগও নেই।

এক ঠিকাদার বলেন, আমিও একজন ঠিকাদার। কিন্তু আজ পর্যন্ত নিজের ব্যক্তিগত লাইসেন্সে কোনো কাজ করতে পারিনি। আমরা অন্যের লাইসেন্স কিনে কাজ করি। হয়তো কেউ কাজ পেলে আমাদের বলে-কয়ে কিছু কাজ দেয়, দিলে দিল, না দিলে আর কিছু করার থাকে না।

যদিও এলাকার মানুষ বলছেন, এ বরাদ্দও পর্যাপ্ত নয়। তাদের আরও দরকার। কারণ ১৭ বছর এ এলাকা ছিল ন্যূনতম উন্নয়ন বঞ্চিত। তাদের দাবি, আগের সরকারে আমলে কোনো কাজ করা হয়নি। বরাদ্দ সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এলাকার অনেক উন্নয়ন হবে।

লটারি পদ্ধতিতে কাজ বরাদ্দ হওয়ার পরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কেন কাজ পেয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী সিহাদুল ইসলাম বলেন, তার ছেলের নামে একটি লাইসেন্স হয়েছিল। সেটি তার রাজনৈতিক কর্মীরাই ব্যবহার করছে। বিষয়টি তিনি আগে থেকেই নিষেধ করতে পারতেন। হয়তো তিনি বিষয়টি বুঝতে পারেননি।

তিনি আরও বলেন, আগে গাবতলী, সিরাজগঞ্জ বা শেরপুর থেকে ঠিকাদারেরা এসে কাজ করতেন। এখন স্থানীয়রা চান, কাজটা তারাই করবেন। এখানে মন্ত্রীর কোনো ভূমিকা নেই। মন্ত্রী হয়তো শুধু অনুরোধ করেছেন। কাজটি সিরাজগঞ্জের মির্জা কনস্ট্রাকশন পেয়েছে। 

যদিও এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুজ্জামানের দাবি, উন্নয়ন কাজ বণ্টনে প্রতিমন্ত্রীর কোনো প্রভাব নেই। তিনি বলেন, ওইভাবে কাজ ছিনিয়ে নেওয়ার কোনো প্রভাব নেই। তবে তদবির থাকতে পারে। ধরুন আমি যদি বলি, ‘স্যার, এখানে একটা মসজিদ লাগবে’, সেটাও তো এক ধরনের তদবির। এর বেশি কিছু নয়।

প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগের শুরু ৩টি নতুন ইউনিয়ন নিজ বংশ ও ছেলেদের নামে নামকরণ করা নিয়ে। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গণশুনানির আয়োজন পরিণত হয় স্বতঃস্ফূর্ত ভোটাভুটিতে। নিজেদের ইউনিয়নের নাম এখন নিজেরাই ঠিক করছেন এলাকাবাসী। তারা চান রহবল ইউনিয়ন হোক।

এছাড়াও এলাকার যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ নিজের নামে করার অভিযোগ প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সেগুলোর বেশিরভাগই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আমলে নামকরণ করা। মীর শাহে আলম তখন আটমূল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। পরে ২০০৯ সালে শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হন।

স্থানীয়রা বলেন, এসব স্থাপনা নতুন নয়, অনেক আগেই নির্মিত হয়েছে। ২০১১-১২ সালে প্রতিষ্ঠিত কিছু প্রতিষ্ঠান থাকলেও, স্কুল-কলেজগুলোর বেশিরভাগই ২০০৩-০৪ সাল থেকেই রয়েছে। এমনকি তার বাড়ির নেমপ্লেটেও ২০০৫ সালের উল্লেখ রয়েছে।

স্থানীয় একজন বলেন, রাস্তাঘাটের সংস্কার কাজ হচ্ছে। স্কুল-কলেজ তো আগেই ছিল। এগুলো আমাদের পরিবারের উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, যত ষড়যন্ত্র বা বাধাই আসুক না কেন, বগুড়ার উন্নয়নের যে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাব। এ জন্য যতটুকু কথা বলা, তদবির করা বা যেখানে যাওয়ার প্রয়োজন হবে, আমরা তা করবো। প্রধানমন্ত্রীর কাছে যতবার বিষয়টি তুলে ধরা প্রয়োজন হবে, আমি এবং বগুড়ার সাতজন সংসদ সদস্য সবসময় সেটিই করে যাবো।

২৪২ শতক জমি কেনার বিষয়ে তিনি বলেন, জমিটি আমার ব্যক্তিগত নামে নয়, আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে কেনা হয়েছে। আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বড়, তাই প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে নিয়মিত জমি ক্রয়-বিক্রয় হয়ে থাকে। স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) এড়াতে আমি নিজে লিমিটেড কোম্পানির পরিচালনায় নেই। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি আমার ছেলে পরিচালনা করছে।

প্রসঙ্গত, সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় মীর শাহে আলমের নিজের স্থাবর সম্পদ ছিল মাত্র ৩১ দশমিক ১৩ শতাংশ জমি। তার স্ত্রীর নামে ২৬ শতাংশ আর নির্ভরশীল দুই ছেলে মেয়ের কোনো জমিই ছিল না। তবে প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর গত ৩ মাসে স্থাবর সম্পদ বেড়েছে আট গুণ।

/এসআইএন

Logo