×
Logo

সারাদেশ

এক হাত হারিয়েও ঝিনাইদহের কৃষকদের আস্থার প্রতীক মফিজ উদ্দিন

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম

এক হাত হারিয়েও ঝিনাইদহের কৃষকদের আস্থার প্রতীক মফিজ উদ্দিন

ভোরের কুয়াশা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। গ্রামের সরু পথ ধরে এক হাতেই মোটরসাইকেল চালিয়ে ছুটছেন এক ব্যক্তি। গন্তব্য ফসলের মাঠ, যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছেন কয়েকজন কৃষক। জমিতে হানা দেওয়া পোকা বা রোগের তাৎক্ষণিক সমাধান 'না' মিললে নষ্ট হতে পারে পুরো ফসল। কৃষকদের এই উৎকণ্ঠার মুহূর্তে যিনি ত্রাতা হয়ে আসেন, তিনিই মফিজ উদ্দিন।

এক নির্মম সড়ক দুর্ঘটনায় ডান হাত হারিয়েছেন তিনি। তবে, হারাননি দায়িত্ববোধ আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছা। বর্তমানে, তিনি ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ব্লকের হাজারো কৃষকের কাছে কেবল একজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নন, তিনি ভরসা ও আস্থার এক অনন্য প্রতীক। 

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে প্রতিদিন যেভাবে তিনি মাঠপর্যায়ে কৃষি সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন, তা এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কালিচরণপুর ইউনিয়নের ছোট মান্দারবাড়িয়া গ্রামের মৃত আফসার উদ্দিন জোয়ার্দারের সন্তান মফিজ উদ্দিন। সাত ভাই ও দুই বোনের বড় পরিবারে জন্ম নেওয়া মফিজ ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামী। 

ফরিদপুর কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন এগ্রিকালচার এবং পরে যশোরের কাজী নজরুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন।

২০০৯ সালের ১১ জানুয়ারি, একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরিরত অবস্থায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ট্রাকের চাপায় তার ডান হাতটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মুহূর্তেই অন্ধকারে ঢেকে যায় ভবিষ্যৎ। 

তবে, চরম মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণাকে সঙ্গী করে ঘুরে দাঁড়ান মফিজ। এক হাত দিয়েই জীবন ও কর্মক্ষেত্রের সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শিখে নেন।

দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির জোরে, ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন মফিজ উদ্দিন। 

যশোর, বরিশাল ও ফরিদপুরে দায়িত্ব পালন শেষে ২০২২ সাল থেকে তিনি কর্মরত আছেন ঝিনাইদহের হলিধানী ব্লকে। এই ব্লকের প্রায় ৪ হাজার ৫৫৩ জন কৃষকের সরকারি কৃষি সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তার কাঁধে।

স্থানীয় কৃষকদের মতে, মফিজ উদ্দিনের প্রকৃত অফিস কোনো চার দেয়ালের দালানকোঠা নয়, তার অফিস হলো কৃষকের মাঠ। হলিধানী ব্লকের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ধানের জমিতে রোগ দেখা দিলে আগে খুব চিন্তায় পড়ে যেতাম। এখন মফিজ ভাইকে ফোন দিলেই চলে আসেন। জমিতে নেমে রোগ শনাক্ত করে ওষুধের নাম বলে দেন। এক হাত না থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে তাকে কখনো আমরা দুর্বল দেখিনি।

কৃষক মো. আলা-আমীন বলেন, অনেক কর্মকর্তা অফিসে বসে থাকেন। কিন্তু মফিজ স্যারকে প্রতিদিন মাঠে দেখা যায়। তিনি আমাদের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করেন। এক হাতে মোটরসাইকেল চালিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানো মফিজ উদ্দিন মনে করেন, মানুষের আসল শক্তি তার শরীরে নয়, মনে।

নিজের কাজ সম্পর্কে মফিজ উদ্দিন বলেন, দুর্ঘটনার পর অনেকেই ভেবেছিলেন আমি হয়তো আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, মানুষ চাইলে যেকোনো বাধা অতিক্রম করতে পারে। কৃষকদের জন্য কাজ করার ইচ্ছাটাই আমাকে শক্তি দেয়। 

তিনি আরও যোগ করেন, কোনো বড় পুরস্কার বা সম্মাননা নয়, কোনো কৃষকের ক্ষতি কমলে কিংবা ভালো ফলন হলে তাদের মুখে যে হাসি ফোটে—সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নুর-এ-নবী এই কর্মকর্তার প্রশংসা করে বলেন, মফিজ উদ্দিন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার কাজে কখনো বাধা হতে পারেনি। তিনি কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আস্থা অর্জন করেছেন।

/এআই 










Logo